«» মূলমন্ত্রঃ : সত্যের পথে,জনগনের সেবায়,অপরাধ দমনে,শান্তিময় সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে" আমরা বাঙালি জাতীয় চেতনায় বিকশিত মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বপক্ষে সত্য এবং ধর্মমতে বস্তুনিষ্ঠ, সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতায় সর্বদা নিবেদিত। «»

ভারতের লোকসভা নির্বাচন

শনিবার, ০৮ জুন ২০১৯ | ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ | 82 বার

ভারতের লোকসভা নির্বাচন
ফাইল ছবি

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির বিপুল জয় হয়েছে। এটা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জয়ই নয়, এর দ্বারা কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক পার্টিগুলোও একেবারে নড়বড়ে হয়ে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের জয়জয়কার হয়েছে।

হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারতে এক ধরনের আদর্শিক ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। এই আদর্শ চরম সাম্প্রদায়িক ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতজুড়ে সিপিআই, সিপিএমসহ বামপন্থী দলগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

এতদিন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে নেহরু-গান্ধী পরিবারের যে একাধিপত্য ছিল, সেই একাধিপত্য এখন আর নেই। কংগ্রেসের রাজনীতি ক্ষেত্রে তাদের পরাজয়ের ও বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে। ভারতের রাজনীতিতে এটা এক বড় রকম উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। এই পরিবারের পঞ্চম পুরুষ রাহুল গান্ধীকে কংগ্রেসের সভাপতি করা হয়েছিল। এর আগে সরাসরি গান্ধী পরিবারে বয়স্ক কেউ না থাকায় রাজীব গান্ধীর স্ত্রী ইটালিয়ান বংশোদ্ভূত সোনিয়া গান্ধীকে কয়েক দফা সভাপতি করা হয়েছিল।

এবারের লোকসভা নির্বাচনের পর এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, রাহুল গান্ধীর পক্ষে সভাপতি থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু কংগ্রেসের এমনই দুরবস্থা যে, গান্ধী পরিবারের বাইরে সভাপতি হওয়ার মতো প্রার্থী কংগ্রেসের মধ্যে পাওয়া এক সমস্যার ব্যাপার। এ কারণে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সব সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে রাহুলকেই সভাপতি রাখার পক্ষপাতী। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে রাহুল পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। কংগ্রেসের মধ্যে এটা এক বড় সাংগঠনিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কংগ্রেসের বাইরে সব বিরোধী দল যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নরেন্দ্র মোদিকে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেছে, তেমনি বিজেপিও কংগ্রেসের গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রচার চালিয়েছে। তাদের এই প্রচারণার কারণেই নির্বাচনের পর কংগ্রেসের সাংগঠনিক অবস্থানে ধস নেমেছে। তবে শুধু কংগ্রেসই নয়, এর ফলে রাজ্যভিত্তিক দলগুলোর মধ্যেও একই ব্যাপার ঘটছে। সেগুলোতেও সাংগঠনিক সংকট দেখা দিয়েছে।

প্রথমেই বলা যেতে পারে উত্তরপ্রদেশের কথা। উত্তরপ্রদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বর্ণের ভিত্তিতে রাজনীতি হয়েছে। নিম্নবর্ণের হিন্দু বা দলিতরা রাজ্যভিত্তিক দল সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টিকে বড় রকম সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। তারাই এই রাজ্যে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় থেকেছে। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো বর্ণভিত্তিক রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে।

সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এমনকি বহুজন সমাজবাদী পার্টির অবিসংবাদী নেত্রী মায়াবতী পর্যন্ত নিজে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন রাজ্য নির্বাচনে। প্রথমবার কংগ্রেস বা রাজ্যভিত্তিক দলগুলোর পরিবর্তে বিজেপি রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় এসেছিল। এবারের নির্বাচনেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

উত্তরপ্রদেশে অসংখ্য হিন্দু নিম্নশ্রেণীর লোকের, বিভিন্ন বর্ণের সংখ্যাধিক্য। তার মধ্যে মায়াবতী এবং সমাজবাদী দলের নিজস্ব বর্ণের লোকরাও আছে। তাদের বর্ণের লোকরা তাদেরকে ভোট দিলেও অন্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা বিজেপিকেই বিপুল সমর্থন জানিয়ে ভোট দিয়েছে। এটা রাজ্যভিত্তিক দলগুলোর পরাজয়ের একটা বড় কারণ। দ্বিতীয়ত, সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি নিজেদের মধ্যে একটা জোট করলেও তারা কংগ্রেসকে এই জোটের বাইরে পরিকল্পিতভাবেই রেখেছিল। এর ফলে কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশের প্রতিটি আসনেই নিজের প্রার্থী দিয়েছিল। এতে ভোট বিভক্ত হয়, যা উত্তরপ্রদেশে বিজেপির জয়ের একটা কারণ।

২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশসহ সারা ভারতে দলিতদের জন্য অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতিই তারা পালন করেনি। এমনকি দলিতদের গো-মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধেও তারা আক্রমণ চালিয়ে তাদের খাদ্য অধিকার হরণ করেছিল। তাদের দ্বারা গরু বিক্রি পর্যন্ত বন্ধ করেছিল। তাদের উপর এ নিয়ে তারা অনেক নির্যাতন করেছে। কিন্তু বিজেপি তাদের মুসলমানবিরোধী হিন্দুত্বের প্রচার এমন ব্যাপক ও শক্তিশালীভাবে করেছে যে, তারা নিজেদের সমস্যার সব বিষয় ভুলে গিয়ে বিজেপির হিন্দুত্বের খপ্পরে পড়ে তাদেরকেই ভোট দিয়েছে।

মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশসহ সর্বত্রই এই একই ঘটনা ঘটেছে। হিন্দুত্বের জোয়ারে ভারতের ভোটাররা ভেসে গেছে। এসব রাজ্যে কৃষিনীতি, কৃষক নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিশাল আকারে কৃষকদের বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও লোকসভা নির্বাচনে তারা নরেন্দ্র মোদিকেই ভোট দিয়েছে! ভোট দেয়ার সময় তাদের নিজস্ব সমস্যাকে তারা গুরুত্ব দেয়নি। তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে মুসলমানবিরোধিতা ও হিন্দুত্বকে। লক্ষ করার বিষয় যে, মাত্র কিছুদিন আগেও রাজ্য নির্বাচনে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপি পরাজিত হলেও সেখানকার লোকসভা নির্বাচনে তারা বিজেপিকেই অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

রাজ্যভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে সব থেকে বড় বিপর্যয় ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৭৭ সাল থেকে সেখানে ৩৭ বছর সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার ছিল। তারপর মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পরপর দু’বার সেখানে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু এখন তাদের অবস্থা শোচনীয়। ৪২ আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ১৯টি আসন।

বিগত নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৩৪। অন্যদিকে এর আগের নির্বাচনে বিজেপি যেখানে পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন, সেখানে এবার তারা পেয়েছে ১৮ আসন। বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গে কিভাবে বিজয় লাভ ও প্রভাব বিস্তার করেছে, এটা হল তারই বড় প্রমাণ। বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের জয় কোনোদিন লাভ করবে, এটা রাজনৈতিক মহলে ছিল চিন্তার বাইরে। পরিস্থিতির এই দিক লক্ষ করে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ‘হাফ’ হবে এবং ২০২১ সালে তাদেরকে ‘সাফ’ করে অর্থাৎ তৃণমূলকে হটিয়ে দিয়ে তারা ক্ষমতায় বসবে।

তৃণমূল ক্ষমতায় এসে চুরি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস পুরোদমে করেছে। মমতা ব্যানার্জি নিজে চোর-দুর্নীতিবাজ না হলেও তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি ব্যাপকভাবে লুটপাট ও সন্ত্রাস করেছে। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীও এই একই কাজ করেছে। মমতা ব্যানার্জি চুরি না করলেও এসবকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং ব্যাপকভাবে সন্ত্রাস করেছেন। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জি যেভাবে সন্ত্রাস করেছেন, ভোটারদেরকে ভোট দেয়া থেকেও বিরত রেখেছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গে অদৃষ্টপূর্ব। এর দ্বারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাদের জয়জয়কার হলেও সেই নির্বাচনই তাদের কবর খুঁড়েছে। এর প্রতিশোধ হিসেবেই পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা মমতা ব্যানার্জিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের জন্য ভোট দিয়েছেন।

মমতা ব্যানার্জির সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। এদিক দিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেভাবে তিনি সমগ্র এলাকায় নির্যাতন চালিয়েছেন, চা বাগান এলাকাগুলোতে শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করেছেন, বন্ধ চা বাগানগুলোকে চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাতে উত্তরবঙ্গের ভোটাররা তৃণমূলকে আর ভোট দেয়নি। এসব এলাকায় তৃণমূলের পরাজয় হয়েছে। এসবের ফলে এখন তৃণমূল থেকে দলে দলে লোক বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে। কাজেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় নিশ্চিত।

শুধু উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নয়, বিহার, দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত- সর্বত্রই স্থানীয় রাজ্য সরকারগুলো প্রায় একই দশাগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় সব রাজ্য সরকারকে হটিয়ে দিয়ে বিজেপি ক্ষমতা দখল করেছে, কয়েকটি রাজ্য ছাড়া। এভাবে বিজেপি সারা ভারতে যেভাবে একাধিপত্য স্থাপন করেছে, এ ধরনের একাধিপত্য দীর্ঘদিন কংগ্রেসের ছিল। কিন্তু পার্থক্য এই যে, কংগ্রেস কখনই সরাসরি আদর্শগতভাবে ভারতে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেনি, যা বিজেপি করেছে। তাদের বিষাক্ত হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এখন হিন্দু ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এই ঐক্যের বিষময় ফল অদূর ভবিষ্যতেই ভারতের নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনগণকে সামগ্রিকভাবে ভোগ করতে হবে। তাদের হাজারও নিজস্ব সমস্যা তাদেরকে তাড়া করবে।

০২.০৬.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

 

ও/আ

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

রাজশাহীতে সাংবাদিক রফিকুলের উপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

Development by: bdhostweb.com

চুরি করে নিউজ না করাই ভাল